.

প্রিয় কবি

অঞ্জন সরকার জিমি অমিত চক্রবর্তী অমিতাভ দাশ গুপ্ত অশোক দেব আন্দালীব আবিদ আজাদ আবুল হাসান আল মাহমুদ আলতাফ হোসেন আহসান হাবীব খোন্দকার আশরাফ হোসেন জয় গোস্বামী জীবনানন্দ দাশ টোকন ঠাকুর তানিম কবির দীপন চক্রবর্তী নবনীতা দেবসেন নির্মলেন্দু গুন নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী পূর্ণেন্দু পত্রী ফয়সল রাব্বি ফারাহ সাঈদ বিনয় মজুমদার বুদ্ধদেব বসু ব্রাত্য রাইসু ভাস্কর চক্রবর্তী মজনু শাহ মন্দাক্রান্তা সেন মহাদেব সাহা মাসুদ খান মুহাম্মদ মরিয়ম মৌ ভট্টাচার্য রণজিৎ দাশ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রিফাত হাসান রুদ্র মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ শক্তি চট্টোপাধ্যায় শঙ্খ ঘোষ শহীদ কাদরী শোয়েব শাদাব শ্বেতা চক্রবর্তী সমর সেন সমুদ্র গুপ্ত সরকার আমিন সাইয়েদ জামিল সিকদার আমিনুল হক সুকান্ত ভট্টাচার্য সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সুনীল সাইফুল্লাহ সুবোধ সরকার সুমন রহমান হুমায়ুন আজাদ হুমায়ূন আহমেদ হেলাল হাফিজ
জয় গোস্বামী লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
জয় গোস্বামী লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

পাখি, হুস

পাখি, হুস
- জয় গোস্বামী


আমার বাড়িতে কোন কাক চিল সকালে বসে না 
মেঘ করুক, বৃষ্টি হোক, রোদ ছুটুক হাসিখুশি মনে
এমন কি বসন্তকাল কুলো দিয়ে হাওয়া করে যাক
কান পাতার উপায় নেই! কেননা তখন যুদ্ধ চলে
মেয়েকে স্কুলের জন্যে তৈরি করা, এবং পড়ানো 
আমার ভুল বাজার, আমার চানের গরমজল
নিজের ঠাকুরঘর, স্নান, বা আনাজপাতি কাটা 
মাঝখানে কুকারের সিটি আর দেরি করে আসা দুধঅলার 
একচিলতে ফাঁক দিয়ে ছুটে ছুটে, দম চেপে রেখে 
এঘর ওঘর করতে পায়ে লেগে গেলাস ওল্টালো 
এই ভাঙল ভুল জায়গায় রাখা কাপ। 
কে রেখেছে? তুমি, তুমি! না, না, তুমি! চাপান উতোর । 
- 'ফিতেটা বাঁধিস নি কেন?' - 'কলমটা কোথায় রাখলে?' 
                     - 'না, আমার চিরুনি নেবে না!'
এই করতে করতে রোজ পানিপথের যুদ্ধ চলে 
কাক চিল কাছেও ঘেঁষে না।

কেবল কোত্থেকে যেন দু-তিনটে সাহসী চড়াই 
ফ্ল্যাটবাড়ির দমচাপা সরু বারান্দায় 
মা মেয়ের হাতে তৈরি খানতিনেক টবের বাগানে
নেমে হুটোপুটি করে, পোকা খুঁজে পায়, ফুল ছেঁড়ে  - 
বুকুনের হাততালিতে 'ফুড়ুৎ' ভেঙচিয়ে 
উড়ে যায়...
দেখতে দেখতে দশটা বাজে। প্রতিদিনকার তুলকালাম 
ঝগড়া মুলতবি রেখে, আমরা সপরিবারে 
সগর্বে বাস ধরতে যাই - 
মাথার ওপরে ঘোরা কাক-চিলরাও 
এ ওকে জানান দেয়ঃ 'দ্যাখ, ভাই, দ্যাখ - '
সত্যিই দেখবার মত ঃ
পাঞ্জাবি ও ঝোলাসহ আমি রোগা দাঁড়কাক, 
পিছনে স্কুল ব্যাগ হাতে গৃহিণী বিরক্ত চিল, 
লাফাতে লাফাতে সামনে 
                বুকুন চড়াই।"      

টিউটোরিয়াল

টিউটোরিয়াল
- জয় গোস্বামী

তোমাকে পেতেই হবে শতকরা অন্তত নব্বই (বা নব্বইয়ের বেশি)
তোমাকে হতেই হবে একদম প্রথম
তার বদলে মাত্র পঁচাশি!
পাঁচটা নম্বর কম কেন? কেন কম?
এই জন্য আমি রোজ মুখে রক্ত তুলে খেটে আসি?
এই জন্যে তোমার মা কাক ভোরে উঠে সব কাজকর্ম সেরে
ছোটবেলা থেকে যেতো তোমাকে ইস্কুলে পৌঁছে দিতে?
এই জন্য কাঠফাটা রোদ্দুরে কি প্যাচপ্যাচে বর্ষায়
সারাদিন বসে থাকতো বাড়ির রোয়াকে কিংবা পার্কের বেঞ্চিতে?
তারপর ছুটি হতে, ভিড় বাঁচাতে মিনিবাস ছেড়ে
অটো-অলাদের ঐ খারাপ মেজাজ সহ্য করে
বাড়ি এসে, না হাঁপিয়ে, আবার তোমার পড়া নিয়ে
বসে পড়তো, যতক্ষণ না আমি বাড়ি ফিরে
তোমার হোমটাস্ক দেখছি, তারপরে আঁচলে মুখ মুছে
ঢুলতো গিয়ে ভ্যাপসা রান্নাঘরে?
এই জন্যে? এই জন্যে হাড়ভাঙা ওভারটাইম করে
তোমার জন্য আন্টি রাখতাম?
মোটা মাইনে, ভদ্রতার চা-জলখাবার
হপ্তায় তিনদিন, তাতে কত খরচা হয় রে রাস্কেল?
বুদ্ধি আছে সে হিসেব করবার?
শুধু ছোটকালে নয়, এখনো যে টিউটোরিয়ালে
পাঠিয়েছি, জানিস না, কিরকম খরচাপাতি তার?
ওখানে একবার ঢুকলে সবাই প্রথম হয়। প্রথম, প্রথম!
কারো অধিকার নেই দ্বিতীয় হওয়ার।
রোজ যে যাস, দেখিস না কত সব বড় বড়
বাড়ি ও পাড়ায়
কত সব গাড়ি আসে, কত বড় আড়ি করে
বাবা মা-রা ছেলেমেয়েদের নিতে যায়?
আর ঐ গাড়ির পাশে, পাশে না পিছনে-
ঐ অন্ধকারটায়
রোজ দাঁড়াতে দেখিস না নিজের বাবাকে?
হাতে অফিসের ব্যাগ, গোপন টিফিন বাক্স, ঘেমো জামা, ভাঙা মুখ -
দেখতে পাসনা? মন কোথায় থাকে?
ঐ মেয়েগুলোর দিকে? যারা তোর সঙ্গে পড়তে আসে?
ওরা তোকে পাত্তা দেবে? ভুলেও ভাবিস না!
ওরা কত বড়লোক!
তোকে পাত্তা পেতে হলে থাকতে হবে বিদেশে, ফরেনে
এন আর আই হতে হবে! এন আর আই, এন আর আই!
তবেই ম্যাজিক দেখবি
কবিসাহিত্যিক থেকে মন্ত্রী অব্দি একডাকে চেনে
আমাদেরও নিয়ে যাবি, তোর মাকে, আমাকে
মাঝে মাঝে রাখবি নিজের কাছে এনে
তার জন্য প্রথম হওয়া দরকার প্রথমে
তাহলেই ছবি ছাপবে খবর কাগজ
আরো দরজা খুলে যাবে, আরো পাঁচ আরো পাঁচ
আরো আরো পাঁচ
পাঁচ পাঁচ করেই বাড়বে, অন্য দিকে মন দিস না,
বাঁচবি তো বাঁচার মত বাঁচ!
না বাপী না, না না বাপী, আমি মন দিই না কোনোদিকে
না বাপী না, না না আমি তাকাই না মেয়েদের দিকে
ওরা তো পাশেই বসে, কেমন সুগন্ধ আসে, কথা বলে, না না বাপী পড়ার কথাই
দেখি না, উত্তর দিই, নোট দিই নোট নিই
যেতে আসতে পথে ঘাটে
কত ছেলে মেয়ে গল্প করে
না বাপী না, আমি মেয়েদের সঙ্গে মিশতে যাই না কখোনো
যেতে আসতে দেখতে পাই কাদা মেখে কত ছেলে বল খেলছে মাঠে
কত সব দুষ্টু ছেলে পার্কে প্রজাপতি ধরছে
চাকা বা ডাঙ্গুলি খেলছে কত ছোটোলোক
না, আমি খেলতে যাই না কখোনো
খেলতে যাইনি। না আমার বন্ধু নেই
না বাপী না, একজন আছে, অপু, একক্লাসে পড়ে
ও বলে যে ওর বাবাও বলেছে প্রথম হতে
বলেছে, কাগজে ছবি, ওর বাবা, ওকে ….
হ্যাঁ বাপী হ্যা, না না বাপী, অপু বলেছে পড়াশোনা হয়নি একদম
বলেছে ও ব্যাক পাবে, ব্যাক পেলে ও বলেছে, বাড়িতে কোথায়
বাথরুম সাফ করার অ্যাসিড আছে ও জানে,
হ্যাঁ বাপী হ্যা, ও বলেছে,
উঠে যাবে কাগজের প্রথম পাতায় …..

(পরিশিষ্ট) পাতার পোশাক

(পরিশিষ্ট) পাতার পোশাক 
- জয় গোস্বামী 


ঐ যে প্রেমিক আর ঐ যে প্রেমিকা 
প্রচুর ঘুমের পিল ব্যাগে নিয়ে ঘুপচি মতন হোটেলে উঠছে 
ঐ যে যুবক আর ঐ যে যুবতী 
ফলিডল শিসি নিয়ে চুপচাপ দরজা দিচ্ছে ঘরে 
ঐ যে ছেলেটি আর ঐ যে মেয়েটি 
রেললাইনের ধারে, ঝোপে ঝাড়ে, দাঁড়িয়ে রয়েছে সন্ধ্যেবেলা
দূরে
লোকালের আলো 
আজ,কাল,পরশু,তরশু 
ওদের সবাইকে অপঘাতে মৃতরূপে খুঁজে পাওয়া যাবে। 
ওরাতো মাস্টার-ছাত্রী 
দেওর-বৌদি তো ওরা 
ওরাতো সুদূর সম্পর্কে ভাইবোন। 
লোকচক্ষু থেকে ওরা এই পথে বাইরে চলে এলো 
আসলে কখন যেন 
হোটেলের ভ্যাপসা ঘর,হাসপাতাল,মর্গ আর রেলখাল ছেড়ে
উঠে গিয়ে
আকাশের একটুখানি ‘পরে বসতি তুলেছে।
হ্যাঁ, জবর দখল।
সেখানে মেঘের তৈরী গাছ, 
সেখানে হাওয়ায় তৈরী কুটির, 
সেখানে পাতা, 
শুধু পাতার পোশাক।
সেখানে এখন ছিন্ন ভিন্ন বৌটিকে ছবি এঁকে দিচ্ছে তার রেলেকাটা কিশোর প্রেমিক।
আঁচলে কষের রক্ত মুছিয়ে মেয়েটি বলছে - তাহলে,এবার একটা গান কর বটাই।
যুবকটি ছুঁয়ে ছুঁয়ে মুছে দিচ্ছে যুবতীর সারা গায়ে মর্গের সেলাই।
আরেক মাথা গরম কবি 
এই মর্ত্যমাঠ থেকে উপরে তাকিয়ে 
দেব-দেবীদের সঙ্গে সমানে হাঙ্গামা করছে। 
স্বর্গের এই জমিটুকু এক্ষুনি ওদের নামে লিখে দেওয়া চাই।
------------- 


নন্দ'র মা

(লেনন-এর 'ইমাজিন' প্রথম কবে শুনেছিলাম মনে নেই। কতটুক বুঝে শুনেছিলাম তাও মনে নেই। এরপরে হয়তো আরো অনেকবার এই গান শুনেছি, বুঝেছি। বয়স বাড়ার সাথে সাথে আরো অনেক কিছু বুঝেশুনে দিনে দিনে প্র্যাক্টিক্যাল হয়ে উঠছি। কিন্তু, এখনো 'ইমাজিন' শুনলে আমার চামড়ার নিচে কেমন জানি একটা শিহরন হয়, গুজবাম্প হয়। মনে হয়- আহা, সত্যি যদি এমন হতো!  আমার জানলা দিয়ে যদি দেখা যেত ইসলামাবাদ, প্যারিস কিংবা এল্যাবামা। কাঁটাতার পেরিয়ে হারিয়ে যাওয়া মানুষের জীবন আমাকে পীড়া দেয়। সারাজীবনের জন্য একটা নদী বা প্রান্তর হারানো মানুষের ব্যাথা আমাকে পীড়া দেয়। মহীনের ঘোড়াগুলি'র রাবেয়া, রুখসানা নিয়ত আমার মন খারাপ করে। ঋত্বিকের নীতা আমাকে গভীরে ভাবায়। সম্প্রতি এই লিস্টে যুক্ত হয়েছে- নন্দ'র মা। জয় গোস্বামী'র অনবদ্য এক চরিত্র। ঋতুপর্ণ ঘোষের সিনেমায় এই কবিতাটা'র রেনডিশন অভিনব)   
   

 নন্দ'র মা
- জয় গোস্বামী




সেই কোন দেশে আমরা যাচ্ছিলাম
কোন দেশ ছেড়ে আমরা যাচ্ছিলাম
পেরিয়ে পেরিয়ে উঁচু-নীচু ঢালু মাঠ
শিশির ভেজানো কাঁটাতার, গাছপালা
আলপথে নেমে আমরা যাচ্ছিলাম
ধানখেত ভেঙে আমরা যাচ্ছিলাম
ছোটবোন আর মা-বাবা, গ্রামের লোক
তার পাশে আমি দুলালী না প্রিয়বালা?

বাবা-মা'র ডাক বাড়িতে দুলালী বলে
প্রিয়বালা নাম দিয়েছিল পাঠাশালা
দু’তিন ক্লাসের লেখা-পড়া সবে শুরু
গ্রামে কে বলল পালারে সবাই পালা
সারা গ্রাম নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছিলাম
মা-বাবা দু’বোন পালিয়ে যাচ্ছিলাম
ঝোঁপঝাড় ঠেলে, হাজামজা নদী ঠেলে
পথে ঘুমন্ত দাঁড়িয়ে ঘরের চালা
ঘুমন্ত বেড়া চালে ঘুমন্ত লাউ
উঠোনে শোয়ানো গরুর গাড়ির চাকা
শোয়ানো লাঙ্গল, দাওয়ায় শিউলি গাছ
ঘোড়া নিমগাছে চাঁদ অর্ধেক ঢাকা
শব্দ না করে চলে যাই তবু ডাল 
নিচু হয়ে এসে ছুঁয়েছে কপাল, মাথা 
শিশিরে ঠান্ডা, ভেজা আর খসখসে
হাতের পাতার মতনই গাছের পাতা
কত কত মাঠ পার হয়ে তারপর
জিরিয়ে নিয়েছি গাছের-ই তলায় বসে
যে যার পোটলা খুলে চিড়ে, গুড়, মুড়ি
শেষে চোখ লেগে এসেছে ক্লান্তি দোষে।

আচমকা দেখি ছুটোছুটি করে লোক
কিভাবে আগুন লেগে গেছে গ্রামে গ্রামে
কই'রে আদুরী? ও দুলালী? তোরা কই?
মা-বাবা ডাকছে আমাদের ডাকনামে
আমি রইলাম; আদুরী ছিটকে গিয়ে
কোথায় পড়ল কেউ জানল না কিছু
আমরা সবাই কাঁটাতার পেরোলাম
আমরা সবাই ঘাড় নীচু, মাথা নীচু
খাতা পেরোলাম ইমিগ্রেশন খাতা
লঞ্চ পেরোলাম তারপর ট্রেনপথ
কোন এক দেশে আমরা যাচ্ছিলাম
যত গেছি তত ছিঁড়ে ছিঁড়ে গেছে পথ
কোথায় সে দেশ? অতীতে? ভবিষ্যতে?


সে কোন বয়স আমরা ছেড়ে এলাম
দুলালী দুলালী, 
প্রিয়বালা প্রিয়বালা
রাস্তায় পড়ে হারিয়ে গিয়েছে নাম
খানিকটা নাম ধানখেতে পড়ে গেছে 
খানিকটা গেছে নদীজলে আঘাটায়
খানিকটা নাম নিয়ে নিল পাঠশালা
খানিকটা গেল রাস্তার কান্নায়
যে গাছের নিচে জিরোতে বসেছিলাম 
খানিকটা নাম সেই গাছটায় আছে
খানিকটা নাম মাঠের শিশির নিল 
খানিকটা গেছে রাত পড়শীর কাছে 
খানিকটা নাম বেড়ায় আটকে গেল 
খানিকটা গোঁজা রইল খড়ের পাতায়
খানিকটা নাম কাঁটাতারে তারে বেঁধা
খানিকটা যায় ইমিগ্রেশন খাতায়।

একটা বয়েস সে দেশে ছেড়ে এলাম 
একটা বয়েস নিয়ে ছেড়ে দিল স্বামী
একটা বয়েস ছেলে বড় করে শেষ
ছেলে'র নামেই আজ চেনাদি' এই আমি
ঠিকে-ঝি ছিলাম 
এখন রাত দিনের খাওয়া পড়া পাই 
এখানে ৫, সি তে
ছেলে বিয়ে করে আলাদা হয়েছে 
আমি এখানেই থাকি গ্রীষ্ম, বর্ষা, শীতে।
এইখানে বসে আমি নন্দ'র মা 
ছেলেকে ভাবি না 
ভাবি না স্বামী'র-ও নাম 
শুধু মনে পড়ে আমরা যাচ্ছিলাম 
সেই কোন দেশে পালিয়ে যাচ্ছিলাম। 
---------------------------------------

মালতীবালা বালিকা বিদ্যালয়

মালতীবালা বালিকা বিদ্যালয়
- জয় গোস্বামী

বেণীমাধব, বেণীমাধব, তোমার বাড়ি যাবো

বেণীমাধব, তুমি কি আর আমার কথা ভাবো?
বেণীমাধব, মোহনবাঁশি তমাল তরুমূলে
বাজিয়েছিলে, আমি তখন মালতী ইস্কুলে
ডেস্কে বসে অঙ্ক করি, ছোট্ট ক্লাসঘর
বাইরে দিদিমণির পাশে দিদিমণির বর
আমি তখন নবম শ্রেণী, আমি তখন শাড়ি
আলাপ হলো, বেণীমাধব, সুলেখাদের বাড়ি
বেণীমাধব, বেণীমাধব, লেখাপড়ায় ভালো
শহর থেকে বেড়াতে এলে, আমার রঙ কালো
তোমায় দেখে এক দৌড়ে পালিয়ে গেছি ঘরে
বেণীমাধব, আমার বাবা দোকানে কাজ করে
কুঞ্জে অলি গুঞ্জে তবু, ফুটেছে মঞ্জরী
সন্ধেবেলা পড়তে বসে অঙ্কে ভুল করি
আমি তখন নবম শ্রেণী, আমি তখন ষোল
ব্রীজের ধারে, বেণীমাধব, লুকিয়ে দেখা হলো
বেণীমাধব, বেণীমাধব, এতদিনের পরে
সত্যি বলো, সে সব কথা এখনো মনে পড়ে?
সে সব কথা বলেছো তুমি তোমার প্রেমিকাকে?
আমি কেবল একটি দিন তোমার পাশে তাকে
দেখেছিলাম আলোর নীচে; অপূর্ব সে আলো!
স্বীকার করি, দুজনকেই মানিয়েছিল ভালো
জুড়িয়ে দিলো চোখ আমার, পুড়িয়ে দিলো চেখ
বাড়িতে এসে বলেছিলাম, ওদের ভালো হোক।
রাতে এখন ঘুমাতে যাই একতলার ঘরে
মেঝের উপর বিছানা পাতা, জ্যো‍‍‌ৎস্না এসে পড়ে
আমার পরে যে বোন ছিলো চোরাপথের বাঁকে
মিলিয়ে গেছে, জানি না আজ কার সঙ্গে থাকে
আজ জুটেছে, কাল কী হবে? – কালের ঘরে শনি
আমি এখন এই পাড়ায় সেলাই দিদিমণি
তবু আগুন, বেণীমাধব, আগুন জ্বলে কই?
কেমন হবে, আমিও যদি নষ্ট মেয়ে হই?

হৃদি ভেসে যায় অলকানন্দা জলে

হৃদি ভেসে যায় অলকানন্দা জলে
- জয় গোস্বামী



অতল, তোমার সাক্ষাৎ পেয়ে চিনতে পারিনি বলে
হৃদি ভেসে গেল অলকানন্দা জলে
করো আনন্দ আয়োজন করে পড়ো
লিপি চিত্রিত লিপি আঁকাবাঁকা পাহাড়ের সানুতলে
যে একা ঘুরছে, তাকে খুঁজে বার করো
করেছো, অতল; করেছিলে; পড়ে হাত থেকে লিপিখানি
ভেসে যাচ্ছিল–ভেসে তো যেতই, মনে না করিয়ে দিলে;
–’পড়ে রইল যে!’ পড়েই থাকত–সে-লেখা তুলবে বলে
কবি ডুবে মরে, কবি ভেসে যায় অলকানন্দা জলে।।

স্নান

স্নান
- জয় গোস্বামী



সংকোচে জানাই আজ: একবার মুগ্ধ হতে চাই।
তাকিয়েছি দূর থেকে। এতদিন প্রকাশ্যে বলিনি।
এতদিন সাহস ছিল না কোনো ঝর্ণাজলে লুণ্ঠিত হবার -
আজ দেখি অবগাহনের কাল পেরিয়ে চলেছি দিনে দিনে …
জানি, পুরুষের কাছে দস্যুতাই প্রত্যাশা করেছো।
তোমাকে ফুলের দেশে নিয়ে যাবে ব’লে যে-প্রেমিক
ফেলে রেখে গেছে পথে, জানি, তার মিথ্যে বাগদান
হাড়ের মালার মতো এখনো জড়িয়ে রাখো চুলে।
আজ যদি বলি, সেই মালার কঙ্কালগ্রন্থি আমি
ছিন্ন করবার জন্য অধিকার চাইতে এসেছি? যদি বলি
আমি সে-পুরুষ, দ্যাখো, যার জন্য তুমি এতকাল
অক্ষত রেখেছো ওই রোমাঞ্চিত যমুনা তোমার?
শোনো, আমি রাত্রিচর। আমি এই সভ্যতার কাছে
এখনো গোপন ক’রে রেখেছি আমার দগ্ধ ডানা;
সমস্ত যৌবন ধ’রে ব্যধিঘোর কাটেনি আমার। আমি একা
দেখেছি ফুলের জন্ম মৃতের শয্যার পাশে বসে,
জন্মান্ধ মেয়েকে আমি জ্যোস্নার ধারণা দেব ব’লে
এখনো রাত্রির এই মরুভুমি জাগিয়ে রেখেছি।
দ্যাখো, সেই মরুরাত্রি চোখ থেকে চোখে আজ পাঠালো সংকেত -
যদি বুঝে থাকো তবে একবার মুগ্ধ করো বধির কবিকে;
সে যদি সংকোচ করে, তবে লোকসমক্ষে দাঁড়িয়ে
তাকে অন্ধ করো, তার দগ্ধ চোখে ঢেলে দাও অসমাপ্ত চুম্বন তোমার…
পৃথিবী দেখুক, এই তীব্র সূর্যের সামনে তুমি
সভ্য পথচারীদের আগুনে স্তম্ভিত ক’রে রেখে
উন্মাদ কবির সঙ্গে স্নান করছো প্রকাশ্য ঝর্ণায়।

মেঘ বলতে আপত্তি কি ?

মেঘ বলতে আপত্তি কি ?
- জয় গোস্বামী


মেঘ বলতে আপত্তি কি ?
বেশ, বলতে পরি
ছাদের ওপোর মেঘ দাঁড়াতো
ফুলপিসিমার বাড়ি
গ্রীষ্ম ছুটি চলছে তখন
তখন মানে ? কবে ?
আমার যদি চোদ্দো, মেঘের ষোলো-সতেরো হবে
ছাদের থেকে হাতছানি দিতো
ক্যারাম খেলবি ? … আয় …
সারা দুপুর কাহাঁতক আর ক্যারম খেলা যায়
সেই জন্যেই জোচ্চুরি হয়
হ্যা,জোচ্চুরি হতো
আমার যদি চোদ্দো, মেঘের পনেরো-ষোলো মত
ঘুরিয়ে দিতে জানতো খেলা শক্ত ঘুঁটি পেলে
জায়গা মত সরিয়ে নিতো আঙ্গুল দিয়ে ঠেলে
শুধু আঙ্গুল ? … বোর্ডের উপর লম্বা ফ্রকের ঝুল
ঝপাং ফেলে ঘটিয়ে দিতো ঘুঁটির দিক ভুল
এই এখানে … না ওখানে ..
এই এইটা না ঐটা
ঝাঁপিয়ে পরে ছিনিয়ে নিলো ঘুঁটির বাক্সটা
ঘুঁটির ও সেই প্রথম মরন
প্রথম মরা মানে ?
বুঝবে শুধু তারাই … যারা ক্যারাম খেলা জানে
চলেও গেলো কদিন পরে .. মেঘ যেমন যায়
কাঠফাটা রোদ দাঁড়িয়ে পড়ল মেঘের জায়গায়
খেলা শেখাও, খেলা শেখাও, হাপিত্যেস কাক
কলসিতে ঠোঁট ডুবিয়ে ছিলো, জল তো পুরে খাক
খাক হোয়া সেই কলশি আবার পরের বছর জলে …
ভরল কেমন তোমায় ? …
ধ্যাত্, সেসব কি কেউ বলে ? …
আত্মীয় হয় .. আত্মীয় হয় ? আত্মীয় না ছাই
সত্যি করে বল এবার, সব জানতে চাই
দু এক ক্লাস এর বয়স বেশি, গ্রীষ্ম ছুটি হলে
ঘুরেও গেছে কয়েক বছর, এই জানে সক্কলে
আজকে দগ্ধ গ্রীষ্ম আমার তোমায় বলতে পারি
মেঘ দেখতাম, ছাদের ঘরে, ফুলপিসিমার বাড়ি